সুলেখা আক্তার শান্তা :
রিনার পিতা দীন মোহাম্মদ উদ্বিগ্ন চিত্তে উকিলের চেম্বারে বসে আছেন। উকিল সাহেব হতাশ কণ্ঠে বললেন, কোন আশা দেখছি না। পাঁচ বছর আগে দীন মোহাম্মদের বড় মেয়ে রিনা হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে যায়। থানা পুলিশ নিয়ে যা যা করার তার সবই করেছেন দীন মোহাম্মদ। কিছুতেই কিছু হয়নি। দীর্ঘদিন পর একদিন থানা থেকে তাকে জানানো হয় তার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছিল। ওই পর্যন্তই। দীন মোহাম্মদ উকিলের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
পাঁচ বছর আগে কথা মনির নামের পাড়ার এক ছেলেকে ভালোবাসতো রিনা। তাদের সম্পর্ক চলত অত্যন্ত সন্তর্পণে। কাকপক্ষীও টের না পায় এমন ভাবে। দীর্ঘদিনের ভালোবাসা বিয়ে করতে চাইতো না মনির। প্রথমদিকে এ নিয়ে মনিরের সঙ্গে রিনার মৃদু বাক্য বিনিময় হোত। ধীরে ধীরে তা উচ্চ বাক্য বিনিময়ে এবং অসহনীয় পর্যায় পৌঁছে। এর মাঝে যখন রিনা জানায় অনাগত সন্তানের কথা, মনিরের মাথা ঘুরে যায়। তার কিছুদিন পর হঠাৎ একদিন রিনা উধাও হয়ে যায়। রিনার বাবা থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। নিখোঁজের তদন্ত গড়াতে থাকে থানার ফাইলে কাগজে কাগজে। রিনা পিতা আশা ছাড়েন না, লেগে থাকেন নিখোঁজ কন্যার হদিস জানতে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে থানায় তদন্তকারী অফিসারের পরিবর্তন হয়। নতুন যারা আসে প্রথম কিছুদিন গুরুত্ব দিয়ে কথা শোনে। তারপর ব্যস্ততার ভান করে এড়িয়ে চলে। রিনার বাবা লেগে থাকেন। অবশেষে পুলিশের একজন তদন্তকারী অফিসার এই তদন্তটি নিয়ে সক্রিয় হন। পাঁচ বছর আগের কথা, অনেক তথ্য প্রমাণ সময়ের গর্ভে হারিয়ে গেছে। নাছোড়বান্দা পুলিশ কর্মকর্তাটি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। বারবার রিনাদের মহল্লা পরিদর্শন করে কোন সূত্র বের করতে চেষ্টা করেন। আলাপ আলোচনা, তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা জারি রাখেন। তিনি জানতে পারেন মনির নামে একজনের সঙ্গে রিনার ঘনিষ্ঠতা ছিল। তদন্ত কর্মকর্তা মনিরকে খুঁজে বের করে জিজ্ঞাসা বাদ করেন। প্রথমে মনির সবকিছুর অস্বীকার করে। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে স্বীকারোক্তি দেয় মনির। বিয়ের ক্রমাগত চাপের কারণে রিনাকে সে হত্যা করেছে।
খুনের মামলার প্রথম প্রমাণ লাশ। হত্যা হলো কিন্তু লাশের কোন অস্তিত্ব কোথায়ও খুঁজে পাওয়া যায় না। মৃত ব্যক্তির ফিরে আসার অনেক নজির আছে। আসামির স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে প্রমানহীন দুর্বল মামলা হিসাবে আদালতে হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হয়। মনির হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে তার দেওয়া স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করে নেয়। পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করে রিনার বাবা। বলে, মেয়েকে তো পাওয়া যাবে না কিন্তু বিচারটা পেলে মেয়ের আত্মা শান্তি পেত। নির্মম হত্যার শিকার হওয়া একজন অসহায় পিতার মর্মযাতনা তিনি বুঝতে পারেন। বলেন, দেখি কী করা যায়। অধিকতর তদন্তের আবেদন মঞ্জুর করে আদালত।
সেদিন ছিল শীতের গভীর রাত। প্রকৃতি যেন ঘুমিয়ে আছে গুটিসুটি মেরে। জন মানবহীন পথপ্রান্তর। সামনে একটা মাঠ তার পাশে ইটের ভাটা। রিনাকে নিয়ে পালিয়ে যাবার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে ছিল মনির। রিনা সরল বিশ্বাসে এসে হাজির হয় মনিরের কাছে। দুই একটা কথা বলার পর হঠাৎ মনির রিনার গলা চেপে ধরে। মুক্ত হতে রিনার প্রাণপণ চেষ্টা বিফল হয়। মুহূর্তেই রিনার নিস্তেজ দেহ লুটিয়ে পড়ে। অনন্তকাল ধরে ভালোবাসার এমন নির্মম পরিণতি নীরবে দেখছে সরব পৃথিবী। মনির মৃতদেহটি ইটভাটায় রেখে চলে যায়। সকালে সে আশা করেছিল বিরাট হট্টগোল হবে মৃতদেহ নিয়ে। আশ্চর্য হয় তেমন কিছু না দেখে। নিশ্চিত হতে আশপাশের এলাকা একবার ঘুরে দেখে। কোথাও রিনার মৃতদেহের কোন চিহ্ন নাই দেখে কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়। বিস্ময় নিয়ে চুপ করে থাকে। ভাবে কোথায় গেল রিনার লাশ।
লাশের এমন অন্তর্ধান রহস্য জনসম্মুখে না এলেও গভীর রাতের বাতাসে সেই কাহিনী ঘুরে বেড়ায়। কেউ কান পাতলে হয়তো শোনা যাবে সেই নির্মম কাহিনী। ইটভাটার আগুন নিয়ন্ত্রণ খুব দায়িত্বপূর্ণ কাজ। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে অগ্নি গহ্বর গুলো। এই কাজটি যে করে তাকে আগুন মিস্ত্রী বলা হয়। সে রাতে ইটভাটার আগুন মিস্ত্রী মমিন কিছুটা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। ঘুম কাটিয়ে ইটভাটার উপরে আগুনের গহবর গুলো পরীক্ষা করে দেখে সব ঠিক মতো জ্বলছে। হঠাৎ অনতি দূরে কালো মতো একটি বস্তু তার চোখে পড়ে। কৌতুহল নিয়ে এগিয়ে গিয়ে যা দেখে তাতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে সে। এক নারীর মৃতদেহ পড়ে আছে। ভেবে পায় না কী করবে এখন! রাত জাগা কর্মী হিসেবে তাকেই প্রথম জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হতে হবে। যত সত্য কথাই বলুক তার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। থানা পুলিশ হবে, তাকে ধরে নিয়েও যেতে পারে। সমস্যা সৃষ্টি করা ছাড়া মৃতদেহের কোন কাজ নাই পৃথিবীতে। হঠাৎ এক পরিকল্পনা আসে তার মাথায়। মৃতদেহটা টেনে নিয়ে যায় ইট ভাটার অগ্নি গহরের পাশে। এখানে ফেলে দিলে আর কোন চিহ্ন থাকবে না। মুহূর্তে ভস্মীভূত হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে দুনিয়া থেকে। যে কথা সেই কাজ। কিন্তু বিধি বাম। মৃতদেহটা ফেলতে গিয়ে তাল সামলাতে পারে না সে নিজেও পড়ে যায় অগ্নি গহভরে। মুহূর্তে দুটি মানুষের চিহ্ন মুছে যায় পৃথিবী থেকে।








